রাজনীতি

প্রায় তিন ডজন মন্ত্রীর পদত্যাগ, ব্যতিক্রম ইশরাক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগ কিংবা মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের ঘটনা নতুন নয়। কখনো দুর্নীতির অভিযোগ, কখনো বিতর্কিত বক্তব্য, আবার কখনো নীতিগত মতবিরোধ ও রাজনৈতিক চাপের কারণে দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে অনেককে। সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার ঘটনায় বিতর্কের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের পর বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।

রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার পর সমালোচনার মুখে পড়েন ইশরাক হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি ও সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে অভিযানে কোনো ভুল করেননি বলেও দাবি করেন তিনি।

ইশরাকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের দায়িত্ব ছাড়ার ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর আগে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে, শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাঁচ ঘটনা

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগ বা অপসারণের পাঁচটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে।

২০০৯ সালে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় পদত্যাগ করেন তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। পরে তিনি জানিয়েছিলেন, মন্ত্রণালয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছিলেন না এবং সংস্কারমূলক কাজে বাধার মুখে পড়েছিলেন।

২০১২ সালে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সহকারী একান্ত সচিব ও রেলের দুই কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি গাড়িতে বিপুল পরিমাণ টাকা পাওয়ার ঘটনায় বিতর্ক তৈরি হয়। সমালোচনার মুখে ওই বছরের ১৬ এপ্রিল পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। তবে তাঁকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে রাখা হয়েছিল।

একই বছর পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সালে কানাডার আদালতেও সংশ্লিষ্ট মামলাটি খারিজ হয়।

২০১৪ সালে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারিত হন তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী।

এরপর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের মন্তব্য ও ফোনালাপের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ওই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগ করেন তিনি।

চারদলীয় জোট সরকারের সময় পদত্যাগ

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ও বাজার পরিস্থিতি ও অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা ঘটে।

২০০৩-০৪ সালের দিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। সে সময় বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের মধ্যে মতবিরোধও প্রকাশ্যে আসে। এর মধ্যে ২০০৪ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে পদত্যাগ করেন আমির খসরু।

২০০৫ সালে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে কানাডীয় প্রতিষ্ঠান নাইকোর কাছ থেকে প্রায় ৯০ লাখ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি উপহার নেওয়ার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর ১৮ জুন দেশে ফিরে পদত্যাগ করেন তিনি।

নব্বইয়ের দশকে পদত্যাগ ও রাজনৈতিক চাপ

১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়ে এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে দায়িত্ব ছাড়তে হয়।

১৯৯৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সরকারের নীতির বাইরে বক্তব্য দেওয়ার পর তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদা পদত্যাগ করেন। ১৯৯৫ সালে সারের সংকট ও কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শিল্পমন্ত্রী জহিরউদ্দিন খানকেও পদত্যাগ করতে হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার পর গ্রেনেড নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কে পড়েন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম। পরে তাঁকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়।

এ ছাড়া বস্তি উচ্ছেদ নিয়ে সমালোচনার মধ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আফসার উদ্দিন আহমদ পদত্যাগ করেন। ১৯৯৭ সালে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ও বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে বিতর্কের পর পদ ছাড়েন সৈয়দ আবুল হোসেন।

এরশাদের শাসনামলে মন্ত্রিসভায় ঘন ঘন পরিবর্তন

১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে মন্ত্রিসভায় একাধিকবার রদবদল হয়। প্রধানমন্ত্রী পদেও পরিবর্তন আসে।

অর্থনীতি, বাজেট ও নীতিগত বিষয়ে মতবিরোধের কারণে ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পদত্যাগ করেন। একই বছর প্রধানমন্ত্রী হন আতাউর রহমান খান। এরশাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে প্রায় নয় মাসের মাথায় তাঁরও বিদায় ঘটে।

পরবর্তী সময়ে মিজানুর রহমান চৌধুরী, মওদুদ আহমদ ও কাজী জাফর আহমদের মতো নেতারা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালের মার্চে পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকারও মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

স্বাধীনতার পর প্রথম সরকারের পদত্যাগ

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ও মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ঘটনা ঘটে।

১৯৭৩ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ত্রাণসামগ্রীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ ও সমালোচনা তৈরি হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন।

১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পদত্যাগপত্র জমা দেন। নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ছিল বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

এ ছাড়া ১৯৭৪ সালের জুলাইয়ে ছয়জন মন্ত্রী ও তিনজন প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের তথ্য একটি ফাঁস হওয়া মার্কিন কূটনৈতিক নথিতে উঠে আসে। স্বাধীনতার প্রথম দশকেই সরকারের ভেতরে মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও পদত্যাগের নজির রয়েছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দল ও সরকারের মধ্যে ডানপন্থী ধারার প্রভাব বাড়ার বিরোধিতা করে ১৯৭৮ সালের ১১ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ পদত্যাগ করেন।

পদত্যাগের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগ, অপসারণ ও দায়িত্ব পরিবর্তনের পেছনে নানা কারণ কাজ করেছে। কখনো দুর্নীতির অভিযোগ, কখনো বিতর্কিত বক্তব্য, কখনো জনঅসন্তোষ, আবার কখনো শারীরিক অসুস্থতা কিংবা নীতিগত মতবিরোধের কারণে দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে।

ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিশেষ দিক হলো, মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার ঘটনা ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আচরণ, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং জনসমক্ষে তাঁদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার ইতিহাসে এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তির পদত্যাগের বিবরণ নয়; বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, জনমত ও ক্ষমতার ভেতরের টানাপোড়েনেরও প্রতিফলন।

এ বিভাগের আরও সংবাদ