গুমের শিকার ব্যক্তিদের গত দুই বছর অবজ্ঞা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে হাস্যরস বা অপসংস্কৃতি চর্চা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে হতাশাগ্রস্ত করতে পারে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত প্রদর্শনী ও প্যানেল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল—‘টু মেক দ্য ডিজঅ্যাপিয়ার্ড অ্যাপিয়ার: ল, জাস্টিস, অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা যারা গুম হয়েছি—তাদের মধ্যে আমি বেঁচে আছি, হুম্মাম কাদের বেঁচে আছেন। আমরা কী জানতাম আমরা বেঁচে থাকব? আমাদের বেঁচে থাকা নিয়ে হাস্যরস করা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে হতাশাগ্রস্ত করবে।”
তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের গত দুই বছর অবজ্ঞা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে এবং তাদের নিয়ে এক ধরনের অপসংস্কৃতি চর্চা করা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে নিজের গুম হওয়ার ঘটনাও স্মরণ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাঁকে তুলে নিয়ে যায় বলে তিনি গুম কমিশনে অভিযোগ করেছিলেন। এরপর ৬১ দিন নিখোঁজ থাকার পর ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়।
শনিবারের অনুষ্ঠানে তিনি জানান, তাঁকে প্রায় ৮ ফুট বাই ৪ ফুটের একটি ছোট কক্ষে ৬১ দিন আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে ছিল একটি পানির কল, শৌচকার্যের জন্য ছোট একটি ছিদ্র এবং মেঝেতে একটি কম্বল—সেটিই ছিল তাঁর শোবার জায়গা।
নিজের সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর মনে হতো—পরের ভোর তিনি দেখতে পারবেন কি না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুমের প্রতিটি ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ এনেছে। প্রস্তাবিত আইনে গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত কীভাবে হবে এবং কারা তদন্ত করবে, সেটিও নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির সন্ধান না পাওয়া গেলে তাঁর উত্তরাধিকারীরা যাতে আইন অনুযায়ী সম্পত্তির অধিকার পান, সেই ব্যবস্থাও আইনে রাখা হয়েছে। অপরাধীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্র সেই ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব নেবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়। বিলটিতে গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রয়েছে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও দাবি করেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে দেশে কোনো এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স (গুম), বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত ও যথাযথ বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমি নিজেও গুমের শিকার। আমি কি চাইব না যে গুম নিয়ে একটি শক্তিশালী আইন হোক? আমরা আজ সরকারে আছি, আগামীতে নাও থাকতে পারি। কিন্তু আইনটা থাকবে। ফলে গুমের শিকার যিনিই হন, তিনি বিচার পাবেন।”
তিনি আরও বলেন, আইনটিতে কোনো ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে; তবে মূল লক্ষ্য হচ্ছে—গুমের শিকার প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ন্যায়বিচারের পথ নিশ্চিত করা।





