জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর শুধু উপকূলীয় অঞ্চল, ঘূর্ণিঝড় কিংবা নদীভাঙনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বড় শহরগুলোও ক্রমেই জলবায়ু সংকটের সরাসরি প্রভাবে পড়ছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা, লবণাক্ততা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ শহরবাসীর জীবনকে কঠিন করে তুলছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ শহরাঞ্চলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। কংক্রিটের বিস্তার, গাছপালা ও খোলা জায়গা কমে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে বাড়ছে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব। এতে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষ বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।
অন্যদিকে অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হলেই রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখল, জলাধার ভরাট এবং অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না। এতে যানজটের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা ও নদীভাঙন বাড়ায় অনেক মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন। এতে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও কর্মসংস্থানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পরিবেশগত সংকটও ক্রমেই গভীর হচ্ছে। শহরের জলাভূমি ও খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় পানি ধারণের প্রাকৃতিক সক্ষমতা হারাচ্ছে নগরগুলো। পাশাপাশি গাছপালা কমে যাওয়ায় বাড়ছে তাপমাত্রা ও বায়ুদূষণ।
তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন শহরে খাল পুনরুদ্ধার, বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নগর জলবায়ু পরিকল্পনা।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনায় নগর পরিকল্পনায় জলাভূমি, খাল ও সবুজ স্থান সংরক্ষণ, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন এবং জ্বালানিসাশ্রয়ী ভবন নির্মাণকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
জলবায়ু সংকট এখন ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। তাই দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার পাশাপাশি আগাম প্রস্তুতি, বৈজ্ঞানিক নগর পরিকল্পনা এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।





