বাদশাহ মিয়া | ফরিদপুর
ফরিদপুরের সালথায় স্বঘোষিত শিক্ষক নেতা সাহেবুলের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড় সমান অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষার্থীর ওপর যৌন নিপীড়ন, কারাবন্দি অবস্থায় বেতন উত্তোলন, পাঠদান ফাঁকি দিয়ে উপজেলা সদরে আড্ডা প্রদান, বিদ্যালয়ে নিয়মিত কোচিং বাণিজ্য এবং শিক্ষকদের অর্থ আত্মসাৎসহ তার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। ১২ নং সিংহপ্রতাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই সহকারী শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতায় অতিষ্ঠ সহকর্মী ও অভিভাবকরা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নটখোলা গ্রামের বাসিন্দা মো. সাহেবুল ইসলাম। তবে তার কর্মকাণ্ডে শিক্ষকসুলভ আচরণের লেশমাত্র নেই বলে স্থানীয়দের দাবি। প্রতিদিন সকালে বিদ্যালয়ে গিয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই তিনি সটকে পড়েন। শিক্ষা অফিসের দোহাই দিয়ে সারা দিন কাটান উপজেলা সদরের চায়ের দোকানে। সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আড্ডা আর দেন-দরবারই তার প্রধান কাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে ছবি দিয়ে নিজেকে ক্ষমতাধর হিসেবে জাহির করেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৪ সালে নটখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকাকালীন চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে তিনি হাতেনাতে ধরা পড়েন। ছাত্রীর মায়ের অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠায়। ১৫ দিন কারাবাস শেষে রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি মুক্ত হন। সরকারি বিধি অনুযায়ী কারাবন্দি থাকাকালীন বেতন-ভাতা উত্তোলনের সুযোগ না থাকলেও আওয়ামী প্রভাব খাটিয়ে তিনি সম্পূর্ণ অর্থ তুলে নেন এবং সার্ভিস বুকে তথ্য গোপনের ব্যবস্থা করেন। এমনকি একটি বলাৎকারের ঘটনাও বিপুল অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
যৌন নিপীড়নের ঘটনার পর তাকে সিংহপ্রতাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। পরে নিজের স্ত্রী টাইফুন নাহারকেও একই বিদ্যালয়ে নিয়ে আসেন। গত আওয়ামী সরকারের আমলে শিক্ষক সমিতির বিভিন্ন পদে থেকে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ৫ই আগস্টের পর ভোল পাল্টে তিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন ঘরানার একনিষ্ঠ কর্মী দাবি করে একটি পকেট কমিটি গঠন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের একটি পুরাতন ঘর নিলামের সময় তিনি প্রভাব খাটিয়ে মালামাল বিক্রি করে টাকা আত্মসাৎ করেন। এছাড়া সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিদ্যালয় কক্ষে তিনি ও তার স্ত্রী প্রাইভেট পড়ান। যারা তার কাছে প্রাইভেট পড়ে না, তাদের শ্রেণি কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া এবং অশোভন আচরণের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
এসব বিষয়ে অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক সাহেবুল ইসলাম বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনিত সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। একটি মহল ষড়যন্ত্র করে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। জেল খাটার বিষয়টিও ছিল চক্রান্ত। আদালত আমাকে মুক্তি দিয়েছেন। যারা দুর্নীতিবাজ তারাই আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
সিংহপ্রতাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা আক্তারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে সহকারী শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা চাই সবাই প্রতিহিংসা ভুলে স্কুলে ফিরে যাক এবং নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করুক।”
উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. তাশেমউদ্দিন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ক্লাস ফাঁকি দিয়ে উপজেলা সদরে ঘোরাঘুরির বিষয়টি দুঃখজনক। আমি অনেক শিক্ষককে সতর্ক করেছি। সাহেবুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”