মন্তব্য প্রতিবেদন (রোজবার্তা)
গেল বছর ১৯ জুলাই লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে আকস্মাৎ আবেগঘন কণ্ঠে মুহতারাম আমিরে জামায়াত জাতীয় মহাসমাবেশে ঘোষণা দিয়েছিলেন— ‘জামায়াত সংসদ সদস্যরা গাড়ি সুবিধা নেবে না, না, না!’
হ্যাঁ, কী বললেন এটা তিনি! বঙ্গ রাজনীতিতে এমপি মহোদয়দের প্রাপ্ত অসীম সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ও মধুময় বস্তুটি হলো ‘গাড়ি’। অর্থাৎ শুল্কমুক্ত গাড়ি পাওয়া যেন তাঁদের মৌলিক অধিকার। আর সেই প্রাপ্যতা ছেড়ে দেওয়ার যে মহত্তম ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন, তা কেবলমাত্র নজিরবিহীন নয়, বিস্ময়কর বটে!
তবে গতকালের দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। সেইদিনের সেই বক্তব্যের দায়বদ্ধতা কি বর্তমান প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা আমিরে জামায়াত ভুলে গেলেন? গতকাল বিরোধী শিবিরের তরুণ তুর্কি সাংসদ হাসনাত আবদুল্লাহ যখন গাড়ি দাবি করার প্রস্তাব তুললেন, তখন আমির মহোদয় মুচকি হেসে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বললেন— ‘ছোটদের আবদার ফেলতে নেই; সাংসদের গাড়ি সুবিধা প্রদানে সরকারপক্ষ সায় দিলে আমি খুশি হবো’।
কী বিচিত্র এই আবদার! মাননীয় আমির মহোদয়, সংসদে কথা বলার সুযোগের ক্ষেত্রে কি ছোট বা বড় বিবেচনা করে সময় বরাদ্দ হয়, নাকি সাংসদ হিসেবে? আর আবদারখানা ছোট হলেও এর ব্যাপ্তি বেশ বড় এবং বিতর্কিত। কারণ, গাড়ি সুবিধা সংসদ সদস্যদের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তা ‘শুল্কমুক্ত’ হওয়াটাই প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া, সমগ্র জাতির সামনে গাড়ি না নেওয়ার যে ওয়াদা আপনি করেছিলেন, সেটিরই বা কী হবে? অন্তত স্নেহময় হাসনাত কেন, এমনকি পুরো সংসদও যদি গাড়ি সুবিধা চায়, সেক্ষেত্রেও আদর্শিক জায়গা থেকে আপনার একা বলা উচিত ছিল— ‘না, না, না’। শুধু বলা নয়, সেটি করে দেখানোই আপনার দায়িত্ব ছিল। তবেই তৈরি হতো এক অনন্য দৃষ্টান্ত!
গাড়ি প্রসঙ্গে কুমিল্লা থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে আসা সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সাহেবের প্রস্তাবটিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কণ্ঠে আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস স্পষ্ট। তিনি বলেন, যেখানে উপজেলা চেয়ারম্যানসহ নির্বাহী কর্মকর্তারা সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন, সেখানে তাঁকে ভাড়া করা গাড়িতে নির্বাচনী এলাকায় যাতায়াত ও জনসাধারণের দেখভাল করতে হয়। ঠিকই তো, এই লজ্জাজনক ব্যবধান ঘোচাতে হলেও প্রয়োজন একখানা গাড়ি। তাছাড়া ব্যাপারটা শুধু লজ্জার নয়, অবমাননাকরও বটে। এই কষ্টবোধ সহ্য করেও যে তিনি গত দুই মাস কাজ করে গেছেন, এটাই জাতির ভাগ্য!
মান্যবর সাংসদ সদস্যগণ চিন্তিত হবেন না, গাড়ি সুবিধা আপনারা পাবেন এবং তা যথারীতি শুল্কমুক্তই হবে। যদিও সংসদ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গাড়ি না নেওয়ার ব্যাপারে অনুশাসন জারি করেছিলেন, তথাপি গাড়ি প্রসঙ্গে সকল সাংসদের জোরালো উৎসাহ তাঁদের সম্মিলিত টেবিল চাপড়ানি থেকেই অনুমেয়। সেই সাথে মান্যবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় যখন এ ব্যাপারে অনুরোধ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর সানুগ্রহ কামনা করেছেন, তখন বিষয়টি উপেক্ষার আর কোনো পথ অবশিষ্ট থাকে না। যার দরুন অচিরেই মহামান্য সংসদ নেতা এ বিষয়ে নমনীয় হবেন এবং মস্ত মস্ত সব নতুন চকচকে বিশালাকৃতির গাড়ি এসে জমা হবে চট্টগ্রাম বন্দরে। তফাৎ শুধু এটুকুই যে, আগে সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে গাড়ি আনতেন, এবার হয়তো সংসদ সচিবালয় নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গাড়িগুলো আনিয়ে দেবে। তবে হ্যাঁ, জ্বালানি সাশ্রয় কিন্তু ৩০ শতাংশ নিশ্চিত করতে হবে— এটুকু বলতে ভুলেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়!