রোজবার্তাঃ বিশেষ প্রতিবেদন
প্রতিটি মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজ অস্তিত্বের কাছে ঋণী ও দায়বদ্ধ। নিজ পরিবার, পরিজন, প্রতিবেশীসহ পরিচিত পরিমণ্ডলের প্রতি যেমন তার নিজস্ব অনুভূতি, দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তদ্রূপ তার দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও রয়েছে অস্তিত্বের গভীর বন্ধন।
গোপালগঞ্জ আমাদের শুধু জন্মস্থান বা পিতৃভূমি নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ সম্পর্কে জানা, বোঝা, চিন্তা করা এবং এগিয়ে নেওয়ার প্রয়াস থাকা আমাদের নৈতিক ও মৌলিক দায়বদ্ধতা।
এই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রয়াস— ‘গোপালগঞ্জের নামকরণের ইতিহাস : পর্ব ২’।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জেলা গোপালগঞ্জ। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে এই জেলাটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে আজকের এই ‘গোপালগঞ্জ’ নামটির পেছনে রয়েছে জমিদারি শাসন, প্রশাসনিক বিবর্তন এবং লোকগাঁথার এক আকর্ষণীয় দীর্ঘ ইতিহাস। গবেষকদের মতে, বর্তমান গোপালগঞ্জ শহরটি একসময় ‘রাজগঞ্জ বাজার’ নামে পরিচিত ছিল।
প্রাচীন প্রেক্ষাপট ও জালালপুর পরগনা
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাচীনকালে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলাটি ‘জালালপুর’ পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমান গোপালগঞ্জ সদর ও কোটালীপাড়া এলাকা ছিল এই পরগনারই অংশ। ১৮১২ সালে প্রশাসনিক প্রয়োজনে মধুমতি নদীকে সীমানা নির্ধারণ করে যশোর ও ঢাকা-জালালপুর জেলাকে পৃথক করা হয়। এই ভৌগোলিক বিন্যাস ও নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের ফলে মধুমতির তীরে অবস্থিত ‘রাজগঞ্জ’ বাজারটির গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।
রানী রাসমণি ও নামকরণের জনশ্রুতি
গোপালগঞ্জ নামকরণের সাথে কলকাতার বিখ্যাত জানবাজারের জমিদার পরিবার ও মহীয়সী নারী রানী রাসমণির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ বিষয়ে মূলত দুটি মতবাদ প্রচলিত রয়েছে:
ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র ও বিবর্তন
ঐতিহাসিক দলিলে পাওয়া যায়, ১৮০০ সালে কলকাতার জানবাজারের জমিদার প্রীতিরাম দাস ১৯ হাজার টাকায় মকিমপুর পরগনা ক্রয় করেন। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র রাজচন্দ্র দাসের স্ত্রী ছিলেন রানী রাসমণি। তাঁদের বংশধর নবগোপালের নাম থেকেই ‘গোপাল’ অংশটি নিয়ে রাজগঞ্জের পরিবর্তে ‘গোপালগঞ্জ’ নামের প্রচলন ঘটে। এখানে ‘রাজগঞ্জ’ থেকে ‘গঞ্জ’ অংশটি বহাল রেখে নতুন নামের প্রবর্তন করা হয়।
প্রশাসনিক উত্তরণ
সময়ের বিবর্তনে জমিদারি শাসনের অবসান ঘটলেও ‘গোপালগঞ্জ’ নামটি স্থায়ী রূপ পায়। ১৮৭০ সালে এটি একটি থানা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে ১৯৮৪ সালে গোপালগঞ্জ মহকুমা থেকে একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে এটি ঢাকা বিভাগের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা।
ইতিহাসের পাতায় গোপালগঞ্জের এই নামকরণ কেবল একটি শব্দের পরিবর্তন নয়; এটি এই অঞ্চলের সামাজিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মধুমতি বিধৌত এই জনপদ আজ তার প্রাচীন ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এগিয়ে চলেছে।