• সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ১০:২৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
শিক্ষাখাতে ঘটতে যাচ্ছে আমূল পরিবর্তন মুকসুদপুরে সংবাদ সম্মেলন করে আ’লীগ নেতার পদত্যাগ মুকসুদপুরে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল ও গ্যাস বিক্রির দায়ে ৩ ব্যবসায়ীকে জরিমানা মুকসুদপুরে যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান স্বাধীনতা দিবস পালিত মুকসুদপুরে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত রোজবার্তা সাক্ষাৎকার মুকসুদপুরে ইজিবাইকের চাকায় পিষ্ট হয়ে শিশুর মৃত্যু মুকসুদপুরে ব্যবসায়ীকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা মুকসুদপুরে ইউএনও’র নেতৃত্বে বিশেষ অভিযান: ঈদযাত্রা ও বাজারদর নিয়ন্ত্রণে কঠোর প্রশাসন গোপালগঞ্জে জীবন উৎসর্গকারী পুলিশ সদস্যদের পরিবারকে আইজিপির ঈদ উপহার ও শুভেচ্ছা বিনিময়

গোপালগঞ্জের নামকরণের ইতিহাস : পর্ব ২

Published রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬

রোজবার্তাঃ বিশেষ প্রতিবেদন

প্রতিটি মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজ অস্তিত্বের কাছে ঋণী ও দায়বদ্ধ। নিজ পরিবার, পরিজন, প্রতিবেশীসহ পরিচিত পরিমণ্ডলের প্রতি যেমন তার নিজস্ব অনুভূতি, দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তদ্রূপ তার দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও রয়েছে অস্তিত্বের গভীর বন্ধন।
গোপালগঞ্জ আমাদের শুধু জন্মস্থান বা পিতৃভূমি নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ সম্পর্কে জানা, বোঝা, চিন্তা করা এবং এগিয়ে নেওয়ার প্রয়াস থাকা আমাদের নৈতিক ও মৌলিক দায়বদ্ধতা।
এই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রয়াস— ‘গোপালগঞ্জের নামকরণের ইতিহাস : পর্ব ২’।

​বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জেলা গোপালগঞ্জ। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে এই জেলাটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে আজকের এই ‘গোপালগঞ্জ’ নামটির পেছনে রয়েছে জমিদারি শাসন, প্রশাসনিক বিবর্তন এবং লোকগাঁথার এক আকর্ষণীয় দীর্ঘ ইতিহাস। গবেষকদের মতে, বর্তমান গোপালগঞ্জ শহরটি একসময় ‘রাজগঞ্জ বাজার’ নামে পরিচিত ছিল।

প্রাচীন প্রেক্ষাপট ও জালালপুর পরগনা

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাচীনকালে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলাটি ‘জালালপুর’ পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমান গোপালগঞ্জ সদর ও কোটালীপাড়া এলাকা ছিল এই পরগনারই অংশ। ১৮১২ সালে প্রশাসনিক প্রয়োজনে মধুমতি নদীকে সীমানা নির্ধারণ করে যশোর ও ঢাকা-জালালপুর জেলাকে পৃথক করা হয়। এই ভৌগোলিক বিন্যাস ও নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের ফলে মধুমতির তীরে অবস্থিত ‘রাজগঞ্জ’ বাজারটির গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।

রানী রাসমণি ও নামকরণের জনশ্রুতি

গোপালগঞ্জ নামকরণের সাথে কলকাতার বিখ্যাত জানবাজারের জমিদার পরিবার ও মহীয়সী নারী রানী রাসমণির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ বিষয়ে মূলত দুটি মতবাদ প্রচলিত রয়েছে:

  • পারিবারিক উত্তরসূরির নাম: প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, মকিমপুর পরগনার জমিদারি সূত্রে রানী রাসমণি এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন। তাঁর এক প্রিয় নাতির নাম ছিল ‘গোপাল’ (মতান্তরে নবগোপাল)। প্রিয় নাতির স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই তিনি তৎকালীন ‘রাজগঞ্জ’ বাজারের সাথে ‘গঞ্জ’ (বাণিজ্য কেন্দ্র) যুক্ত করে নতুন নাম রাখেন ‘গোপালগঞ্জ’।
  • সিপাহী বিদ্রোহ ও জমিদারি লাভ: লোকমুখে শোনা যায়, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় রানী রাসমণি জনৈক ইংরেজ কর্মকর্তার প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। এর পুরস্কারস্বরূপ ইংরেজ সরকার তাকে সম্পূর্ণ মকিমপুর পরগনা দান করে। পরবর্তীতে তাঁর বংশধরের নামানুসারে অঞ্চলটির নামকরণ করা হয়।

ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র ও বিবর্তন

ঐতিহাসিক দলিলে পাওয়া যায়, ১৮০০ সালে কলকাতার জানবাজারের জমিদার প্রীতিরাম দাস ১৯ হাজার টাকায় মকিমপুর পরগনা ক্রয় করেন। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র রাজচন্দ্র দাসের স্ত্রী ছিলেন রানী রাসমণি। তাঁদের বংশধর নবগোপালের নাম থেকেই ‘গোপাল’ অংশটি নিয়ে রাজগঞ্জের পরিবর্তে ‘গোপালগঞ্জ’ নামের প্রচলন ঘটে। এখানে ‘রাজগঞ্জ’ থেকে ‘গঞ্জ’ অংশটি বহাল রেখে নতুন নামের প্রবর্তন করা হয়।

প্রশাসনিক উত্তরণ

সময়ের বিবর্তনে জমিদারি শাসনের অবসান ঘটলেও ‘গোপালগঞ্জ’ নামটি স্থায়ী রূপ পায়। ১৮৭০ সালে এটি একটি থানা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে ১৯৮৪ সালে গোপালগঞ্জ মহকুমা থেকে একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে এটি ঢাকা বিভাগের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা।

​ইতিহাসের পাতায় গোপালগঞ্জের এই নামকরণ কেবল একটি শব্দের পরিবর্তন নয়; এটি এই অঞ্চলের সামাজিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মধুমতি বিধৌত এই জনপদ আজ তার প্রাচীন ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এগিয়ে চলেছে।


More News Of This Category