রোজবার্তাঃ
প্রতিটি মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজ অস্তিত্বের কাছে ঋণী ও দায়বদ্ধ। নিজ পরিবার, পরিজন, প্রতিবেশীসহ পরিচিত পরিমণ্ডলের প্রতি যেমন তার নিজস্ব অনুভূতি, দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তদ্রূপ তার দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও রয়েছে অস্তিত্বের গভীর বন্ধন।
গোপালগঞ্জ আমাদের শুধু জন্মস্থান বা পিতৃভূমি নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ সম্পর্কে জানা, বোঝা, চিন্তা করা এবং এগিয়ে নেওয়ার প্রয়াস থাকা আমাদের নৈতিক ও মৌলিক দায়বদ্ধতা।
এই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রয়াস— ‘গোপালগঞ্জের ইতিহাস : পর্ব ১’।
মধুমতি নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে আজকের গোপালগঞ্জ শহর। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে বাংলাদেশ–এর ঢাকা বিভাগ–এর অন্তর্গত এ অঞ্চল ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিশেষ মর্যাদা বহন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান–এর জন্মস্থান হওয়ায় গোপালগঞ্জ জাতীয় ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাচীন ইতিহাস
গোপালগঞ্জ অঞ্চল প্রাচীনকালে সমতট ও বঙ্গ অঞ্চলের অন্তর্গত ছিল। পাল ও সেন যুগে এ অঞ্চলে হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়, এ অঞ্চলে প্রাচীন সভ্যতার চিহ্ন বিদ্যমান ছিল। নদীবেষ্টিত হওয়ায় বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এ অঞ্চলের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
মধ্যযুগ
মুসলিম শাসনামলে গোপালগঞ্জ অঞ্চল প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুলতানি ও মোগল আমলে এখানে কৃষি ও নদীপথের বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। মোগল শাসনামলে জমিদারি প্রথার বিকাশ ঘটে এবং বহু মসজিদ ও স্থাপনা নির্মিত হয়।
ব্রিটিশ শাসনামল ও প্রশাসনিক পরিবর্তন
১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলা যশোর জেলার অন্তর্গত ছিল এবং অবশিষ্ট অংশ ঢাকা-জালালপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১৮০৭ সালে মুকসুদপুর থানা যশোর থেকে ফরিদপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়।
ফরিদপুর জেলার একটি পরগনার নাম ছিল জালালপুর। গোপালগঞ্জ সদর ও কোটালীপাড়া জালালপুর পরগনার অন্তর্গত ছিল।
১৮১২ সালে চান্দনা (মধুমতি) নদী যশোর ও ঢাকা-জালালপুর জেলার বিভক্ত রেখা হিসেবে নির্ধারিত হয়।
সে সময় গোপালগঞ্জ-মাদারীপুর এলাকা ছিল বিস্তীর্ণ জলাভূমি এবং নৌ-ডাকাতির প্রকোপ ছিল বেশি। প্রশাসনিক সুবিধার্থে ১৮৫৪ সালে বাকেরগঞ্জ থেকে বিভাজিত হয়ে মাদারীপুর মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৮৭২ সালে মাদারীপুর মহকুমায় গোপালগঞ্জ থানা গঠিত হয়।
১৮৭৩ সালে মাদারীপুর মহকুমা বাকেরগঞ্জ থেকে ফরিদপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়।
১৯০৯ সালে মাদারীপুর মহকুমা ভেঙে গোপালগঞ্জ মহকুমা গঠন করা হয়। গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া ও মুকসুদপুর থানা নবগঠিত মহকুমার অন্তর্ভুক্ত হয়।
গোপালগঞ্জের প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন জনাব সুরেশ চন্দ্র সেন।
১৯১০ সালে মহকুমা প্রশাসকের বেঞ্চ কোর্ট ফৌজদারি কোর্টে উন্নীত হয়।
১৯২১ সালে গোপালগঞ্জ শহরের মান উন্নীত হয়। তখন আদমশুমারি অনুযায়ী লোকসংখ্যা ছিল ৩,৪৭৮ জন।
১৯২৫ সালে গোপালগঞ্জে সিভিল কোর্ট চালু হয়।
১৯৩৬ সালে মুকসুদপুর থানা বিভক্ত হয়ে কাশিয়ানী থানা গঠিত হয়।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়
স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক কাঠামোয় আরও পরিবর্তন আসে।
১৯৭৪ সালে গোপালগঞ্জ সদর থানা বিভক্ত হয়ে টুঙ্গিপাড়া থানা গঠিত হয়।
অবশেষে ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়।
গোপালগঞ্জ জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক ছিলেন জনাব এ. এফ. এম. এহিয়া চৌধুরী।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও আত্মপরিচয়
গোপালগঞ্জ কেবল প্রশাসনিক সীমানায় সীমাবদ্ধ একটি জেলা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনার অন্যতম উৎস।
নদী, ইতিহাস, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে গোপালগঞ্জ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
প্রাচীন বঙ্গ থেকে সুলতানি, মোগল, ব্রিটিশ ও স্বাধীন বাংলাদেশ—প্রতিটি যুগে গোপালগঞ্জ নিজস্ব পরিচয় অটুট রেখেছে।
মধুমতির তীরবর্তী এই জনপদ আজও আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে আছে।