রোজবার্তা সম্পাদকীয়ঃ মো তারিকুল ইসলাম
২১ ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের জাতীয় জীবনে এক বিশেষ আবহ তৈরি হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই নগর-নগরী, গ্রাম-গঞ্জ থেকে মানুষ খালি পায়ে শহীদ মিনারের পথে হাঁটে। সাদা-কালো শাড়ি-পাঞ্জাবিতে শোকের প্রতীকী উপস্থিতি, ফুলে ভরা বেদি, সমবেত কণ্ঠে উচ্চারিত— “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?”
কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই— আমরা কি সত্যিই ভুলিনা? নাকি একদিনের আবেগে স্মরণ করে বছরের বাকি ৩৬৪ দিন নিঃশব্দ বিস্মরণে ফিরে যাই?
একুশকে আমরা কীভাবে দেখি— সেটিই আজকের আলোচ্য। এটি কি কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান? একটি সামাজিক সমাবেশ? ইতিহাস স্মরণের বংশানুক্রমিক রীতি? নাকি শেষ বিচারে এটি একটি রাজনৈতিক চেতনার উৎস?
ভাষা থেকে রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ছাত্রজনতার ওপর গুলিবর্ষণ কেবল ভাষার দাবিকে রক্তাক্ত করেনি; তা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি স্থাপন করেছে। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বাররা প্রাণ দিলেন। কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ ভাষার স্বীকৃতির গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতিসত্তার জাগরণে পরিণত হয়।
একুশের মধ্যেই বাঙালি প্রথমবার উপলব্ধি করেছিল— সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অসম্ভব। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; ছিল অস্তিত্বের প্রতীক। তাই একুশের চেতনা পরবর্তী সময়ে ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২-র ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৬-র ছয়দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ভেতর ধারাবাহিক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
অতএব একুশকে কেবল সাংস্কৃতিক বললে তার রাজনৈতিক তাৎপর্যকে খাটো করা হয়। আবার একে কেবল রাজনৈতিক বললেও তার মানবিক ও সাংস্কৃতিক গভীরতাকে অস্বীকার করা হয়। একুশ মূলত বহুমাত্রিক— সাংস্কৃতিক চেতনার ভেতর রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ, আর রাজনৈতিক দাবির ভেতর সাংস্কৃতিক মর্যাদার ঘোষণা।
আনুষ্ঠানিকতা বনাম অন্তর্গত শ্রদ্ধা
গতবছর একুশ উদযাপনে কোথাও কোথাও এক ধরনের দায়সারা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। মধ্যরাতে ফুল দেওয়া, সামাজিক মাধ্যমে ছবি পোস্ট, দায়সারা কিছু আলোচনা যেন কিছু করা লাগবে তাই করা। আশার ব্যাপার হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এ বছর একুশ ফিরেছে তার স্বাভাবিক উদযাপনে।
আমাদের সমাজ আজ দ্বিধাবিভক্ত। রাজনৈতিক অবস্থান প্রায়ই নির্ধারণ করে দেয় কার আবেগ কত গভীর, কার শ্রদ্ধা কতটা আন্তরিক। ফলে একুশের মতো সর্বজনীন চেতনার দিনও কখনও কখনও দলীয় রঙে রঞ্জিত হয়। অথচ একুশের শিক্ষা ছিল ভিন্নমতের স্বাধীনতা, প্রতিবাদের অধিকার এবং সাংস্কৃতিক মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীনতা।
যদি ভাষার নামে বিভাজন সৃষ্টি হয়, যদি ইতিহাসকে আংশিকভাবে উপস্থাপন করা হয়, যদি আত্মসমালোচনার পরিবর্তে আত্মতুষ্টি স্থান দখল করে— তবে একুশের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা কতটা সত্য?
একুশের আসল শক্তি
একুশ আমাদের শিখিয়েছে— শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে। এটি কেবল অতীতের গৌরব স্মরণ নয়; বর্তমানের দায়বদ্ধতার শপথ। ভাষাকে ভালোবাসা মানে কেবল মাতৃভাষায় কথা বলা নয়; ভাষায় চিন্তা করা, সৃজন করা, প্রশ্ন তোলা এবং প্রতিবাদ করা।
একুশ আমাদের সামনে একটি নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করে। আমরা কি ভিন্নমতকে সম্মান করি? আমরা কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করি? আমরা কি আমাদের শিক্ষা, প্রশাসন ও সংস্কৃতিতে ভাষার মর্যাদা নিশ্চিত করি? যদি না করি, তবে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ কেবল প্রতীকী আচরণে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
একুশ: আত্মজিজ্ঞাসার দিন
একুশের প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই— এটি আমাদের আত্মজিজ্ঞাসায় বাধ্য করে। আমরা কেমন সমাজ গড়ছি? আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কতটা সহিষ্ণু? আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক?
একুশকে যদি আমরা কেবল শোকের দিন বানাই, তবে তার বিপ্লবী শক্তিকে নিঃশেষ করি। একুশ মূলত প্রতিবাদের দিন, ন্যায়ের দাবির দিন, মর্যাদার শপথের দিন। এটি একটি ধারাবাহিকতার নাম— যা ভাষা থেকে স্বাধীনতা, স্বাধীনতা থেকে গণতন্ত্র, আর গণতন্ত্র থেকে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের পথ দেখায়।
একুশ কোনও একদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জাতিসত্তার স্থায়ী শপথ। শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ভাষার মর্যাদা রক্ষা, ইতিহাসের প্রতি সততা এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ।
যদি আমরা সত্যিই বলতে চাই— “আমি কি ভুলিতে পারি?” — তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না বছরের বাকি দিনগুলোতেও একুশকে ধারণ করতে হবে।
অমর একুশ হোক আমাদের সংস্কৃতির দীপ্তি, রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি এবং সমাজ নির্মাণের অটল অঙ্গীকার। তবেই একুশ হবে কেবল স্মরণ নয়— হবে চলমান প্রতিশ্রুতি।