রোজবার্তাঃ
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন মুকসুদপুরের বাঁশবাড়ীয়া ইউনিয়নের ঝুটিগ্রাম নিবাসী ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান এম. আনিসুল ইসলাম মিয়া। পেশায় সফল ব্যবসায়ী ও রাজনীতি থেকে প্রায় সম্পূর্ণ দূরে থাকা ষাটোর্ধ্ব বয়সী আনিসুল ইসলামের নির্বাচনে অংশগ্রহণ অনেকের মনেই প্রশ্নের উদ্রেক করেছিল—জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় কেন সংসদ সদস্য পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন নির্বাচনি যুদ্ধে হঠাৎ অবতরণ? সেই সাথে অনেকের ধারণা ছিল যে, শেষ পর্যন্ত হয়তো তিনি নির্বাচনী মাঠে আসবেন না, অথবা আসলেও টিকতে পারবেন না।
অথচ সমস্ত আশঙ্কা ও প্রশ্নের ইতি টেনে আনিসুল ইসলাম নিজের সবটুকু প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচনি প্রচারণায় ছুটে বেড়িয়েছেন। দল, মত ও সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে থেকে নিজস্ব আত্মবিশ্বাস এবং একদলনিষ্ঠ কর্মীদের সাথে নিয়ে তিনি মাঠে ছিলেন সক্রিয়।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে অন্য চারজন নির্দলীয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও প্রায় ৪ হাজার ২০০ ভোটারের সমর্থনে টিকে যান আনিসুল ইসলাম। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তার সম্পদ ও বাৎসরিক আয় শুধুমাত্র গোপালগঞ্জ-১ আসন নয়, বরং জেলার তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সকল প্রার্থীর চেয়ে বেশি। তথাপি অর্থের বিনিময়ে ভোট পাওয়া বা কৃত্রিম ডামাডোল না বাজিয়ে নিরেট সাদাসিধা বক্তব্য এবং সদাচরণের মাধ্যমেই তিনি ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন।
নির্বাচনি ফলাফলে তিনি তার জমাকৃত সমর্থনের চেয়েও কম ভোট পেলেও, ঈদ উপলক্ষে ‘রোজবার্তা’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ভোটের সংখ্যার চেয়ে মানুষের ভালোবাসার মূল্যায়নই তার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণ:
কেন নির্বাচনে অংশ নিলেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, এবারের নির্বাচনটি জাতীয়ভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও আকাঙ্ক্ষিত ছিল। সেই ভোটকে উৎসবমুখর ও অংশগ্রহণমূলক করার স্বার্থেই তার এই অংশগ্রহণ। তার মতে, নির্বাচনের পরিবেশ ভালো ছিল এবং তিনি কোনো বড় প্রতিবন্ধকতা দেখেননি।
প্রতিপক্ষ প্রার্থী ও আইনি প্রসঙ্গ:
দুজন শক্তিশালী প্রার্থীর কারারুদ্ধ থাকা এবং তাদের পর্যাপ্ত প্রচারণার সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “তারা উভয়ই দীর্ঘদিন রাজনীতির সাথে জড়িত এবং নির্বাচনে সাফল্য দেখিয়েছেন—এটা সবার মতো আমারও জানা। কিন্তু তাদের আটকে থাকা বা জামিন না পাওয়া সম্পূর্ণভাবে আইনি ও বিচারাধীন বিষয়। এ সম্পর্কে নিজস্ব কোনো অভিমত প্রদানের সুযোগ নেই।”
জয়ী প্রার্থী সম্পর্কে মূল্যায়ন:
নির্বাচিত বিএনপি প্রার্থী সম্পর্কে আনিসুল ইসলাম জানান, বর্তমান এমপি অতীতে একবার ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন, ফলে তার একটি পূর্বপরিচিতি ছিল। সেই সাথে আওয়ামী লীগের নির্বাচন নিষিদ্ধ থাকার সুযোগটি তিনি সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন। যদিও তার কিছু ভূমিকা অনেক প্রার্থী বা সমর্থকদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ, তবু এটি সত্য যে তিনি শেষ পর্যন্ত স্থানীয় নেতাদের নিজের পক্ষে টানতে পেরেছেন। এমনকি আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী পদত্যাগ করে ধানের শীষের হয়ে কাজ করেছেন। দলীয় প্রভাব, ভিন্ন শিবিরের ব্যাপক সমর্থন এবং আঞ্চলিক আবেগ—সব মিলিয়ে কাশিয়ানীর ভোটারদের নিরঙ্কুশ সমর্থনে তিনি জয়ী হয়েছেন।
সরকারের পদক্ষেপ ও অর্থনীতি:
একজন সংসদ সদস্যের নিজ এলাকার উন্নয়ন এবং জাতীয় স্বার্থ—উভয় দিককেই সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার শুরুতেই ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-পুরোহিতদের ভাতা প্রদান এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের মতো জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবে এসব প্রকল্প চালু করা আর সুষ্ঠুভাবে সচল রাখা এক কথা নয়। অতীতে অনেক সরকার তাদের কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো কতটা স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।”
ব্যবসায়ী হিসেবে তার ধারণা, বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থা এবং আধিপত্যবাদী শক্তির অর্থনৈতিক ও সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা নতুন সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “দুর্নীতি মুক্ত হতে না পারলে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দিকে যাবে।”
বিরোধী দল ও ভবিষ্যৎ ভাবনা:
বর্তমান বিরোধী দল সম্পর্কে তার মন্তব্য—তাদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নেই এবং অধিকাংশ সদস্যই নতুন। তবে তাদের উচিত সরকারকে গঠনমূলক সহযোগিতা ও সমালোচনা করা। সামগ্রিকভাবে এম. আনিসুল ইসলাম মনে করেন, সরকারকে সুযোগ দিতে হবে এবং জনগণকে সচেতন থাকতে হবে।
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, “একমাত্র মৃত্যু ব্যতীত যেকোনো পরিস্থিতিতে আমি মানুষের পাশে থাকব এবং জনকল্যাণে আমার তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।”