রোজবার্তা | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
তেহরান, ইরান: ইরানের দীর্ঘসময়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) তেহরানে তাঁর নিজস্ব কম্পাউন্ড লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় ৮৬ বছর বয়সী এই নেতার মৃত্যু হয়। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম’ আজ রোববার ভোরে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শনিবার সকালে আমেরিকা এবং ইসরায়েলি বাহিনীর (যাকে ইরান ‘জায়নিস্ট শাসন’ হিসেবে অভিহিত করে) যৌথ অভিযানে খামেনি ‘শহীদ’ হয়েছেন। এই হামলায় খামেনির মেয়ে, জামাতা এবং নাতিও নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেমের নজরদারি এড়াতে ব্যর্থ হয়েছেন খামেনি ও তাঁর সহযোগীরা।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের হাল ধরেন আলী খামেনি। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর প্রধান স্থপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮০-র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সেই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মধ্যে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়, যা তাঁর পরবর্তী শাসনামলের মূল ভিত্তি ছিল।
আলী খামেনির শাসনামল অসংখ্য চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০০৯ সালের নির্বাচন পরবর্তী বিক্ষোভ, ২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুকেন্দ্রিক আন্দোলন এবং অতি সম্প্রতি অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশব্যাপী গণবিক্ষোভ তাঁর শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সমালোচকদের মতে, তিনি আধুনিক ইরানের তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে দেশের ভেতরে তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।
খামেনির সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রজেক্ট ছিল ‘অক্ষশক্তি’ বা ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ (Axis of Resistance) গড়ে তোলা। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং সিরিয়ার আসাদ সরকারকে সাথে নিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে এক শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর ধারাবাহিক হামলা এবং কাসেম সোলেইমানির মতো শীর্ষ জেনারেলদের হারিয়ে এই অক্ষশক্তি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ভাষণে এই হামলাকে ইরানের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ (Regime Change) একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইরানি জনগণের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “আপনাদের স্বাধীনতার সময় ঘনিয়ে এসেছে।” অন্যদিকে, ইরানের ভেতরে এই ঘটনার পর চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সামরিক বাহিনী ও সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী উত্তরাধিকারী নির্বাচন নিয়ে পুরো বিশ্ব এখন গভীর পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)