• সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:৪৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
র‍্যাবের যৌথ অভিযানে কাশিয়ানীর আলোচিত মোকলেস হত্যা মামলার দুই আসামি আটক গোপালগঞ্জ জেলায় ১৯৭টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ মুকসুদপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সরকারি জমি দখলের দায়ে একজনের ১০ দিনের কারাদণ্ড মুকসুদপুরে এস.জে মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত সরকারি মুকসুদপুর কলেজে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত গোপালগঞ্জের শ্রমিক নেতা বাবু হত্যা মামলায় ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড মুকসুদপুরে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের পথসভা গোপালগঞ্জ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ব্যানার–ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ এই নির্বাচন বেগম খালেদা জিয়ার অর্জন মুকসুদপুরে নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মশালার সফল সমাপ্তি

নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা ফিরছে !

Published সোমবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২৬

রোজবার্তা :

২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ-এর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের নির্বাচন কমিশন। নির্ধারিত পূর্ণমেয়াদ শেষে ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা কমিশনের কার্যকাল সম্পন্ন হলে ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কাজী হাবিবুল আওয়াল প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যিনি ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে পদত্যাগের মাধ্যমে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার অধ্যায়ের শেষ হয়। অর্থাৎ ২০১২ থেকে ২০২৪-এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে তিনটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছেন তারা প্রত্যেকেই শুধুমাত্র মুখে নির্বাচনী নীতিমালা ও নিজেদের নিরপেক্ষতার সাফাই দিয়ে গেছেন কিন্তু কার্যত তাদের ভূমিকা এবং কার্যক্রম সবটাই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ ও দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ধ্বংসের নামান্তর। যদিও এদের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মরহুম মাহাবুব তালুকদার, যিনি দায়িত্বে থাকাকালীন তার সময়ের হুদা কমিশনের প্রায় প্রতিটি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কমিশন বৈঠকে ও সাংবাদিক সম্মেলনে সহ সর্বত্র সমালোচনা জারি রেখেছিলেন এবং নির্বাচনী অব্যবস্থাপনার দায়মুক্তি চেয়েছিলেন।


আওয়ামী লীগ-এর মহাজোট সরকার গঠিত হয় ২০০৮ সালে এ কে এম শামসুল হুদা কমিশনের নেতৃত্বে। যার সম্পর্কে তৎকালীন সেনাসমর্থিত সরকারের প্রভাবে কিছু রাজনৈতিক দল গঠন বা ভাঙার বিষয়ে অভিযোগ থাকলেও শেষপর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার ও জাতীয় নির্বাচনটি নিরপেক্ষভাবেই সম্পন্ন করেছিলেন। অতঃপর ধারাবাহিক তিনটি নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র সরকারের পক্ষে নির্বাচনে বিজয় সুনিশ্চিতের কাজ করেছেন তাই নয়, সেই সাথে তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল সুস্পষ্ট। তারা নিজেরাই সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যাতে নির্বাচনে অংশ না নেয় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ সাধারণ ভোটার যেন নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ হারায় সেসব সাগ্রহে করে গেছেন।

প্রতিটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের পূর্বে তাদের দফায় দফায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের সাথে বৈঠক করে করে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচারে দেশবাসীকে দেখাতে চাইতো তাদের তৎপরতা ও কার্যদক্ষতা। যদিও এসবই ছিল শুধুমাত্র শেখ হাসিনা সরকারের আনুকূল্য গ্রহণ ও সুবিধা প্রদানের মুখ্য উদ্দেশ্য। তারা প্রতিবার বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের মতামত উপেক্ষা করে নির্বাচন আয়োজনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে এমন সব অবাস্তব ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় যেমন ইভিএম পদ্ধতি, সংসদীয় আসন নির্ধারণ, কিছু রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন প্রদান ও কিছু নিবন্ধনযোগ্য দলকে নিবন্ধন না দেওয়া, অতিরিক্ত ব্যালট ছাপা, নির্বাচনী পর্যবেক্ষক নিজেদের ইচ্ছেমতো দেওয়া, সংবাদকর্মীদের প্রতি বাধানিষেধসহ এহেন অপকর্ম নেই যা তারা করেননি। এমনকি স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় মার্কা দেওয়া ও ভিন্ন দলের প্রার্থীদের প্রতি সবরকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি সহ ভোটারদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করা ছিল তাদের প্রধানতম কর্ম। আর তারা প্রতিটি নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের পূর্বে এবং তড়িঘড়ি আয়োজনে ছিল অসামান্য দক্ষ। যাতে করে অন্যান্য দল ও প্রার্থীরা প্রস্তুতি নিতে না পারে এবং তাদের প্রার্থিতায় নিজে জটিলতা সৃষ্টি হয়।


যার জন্য গত তিনটি জাতীয় নির্বাচন ও বিজয়ী প্রার্থীদের দেশের মানুষ দশম নির্বাচনে ‘বিনা ভোটের এমপি’, একাদশ নির্বাচনে ‘রাতের এমপি’ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ‘ডামি ইলেকশন’ নামে অবহিত করে সরকার, সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি ধিক্কার ও প্রতিবাদ জানায়।


৫ জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী ড. ইউনুস সরকারের প্রধানতম দায়িত্বের সর্বপ্রধান হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন আয়োজন ও সুসম্পন্ন করা। সেমতে ২৪ নভেম্বর ২০২৪ প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকারী এ এম এম নাসিরউদ্দিন-এর নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশন প্রথম থেকেই এযাবৎকালের সর্বাপেক্ষা রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ নানাবিধ চাপে জর্জরিত। একদিকে পুরো ধসে পড়া নির্বাচনী ব্যবস্থা গঠন, দ্বিতীয়ত পরিশুদ্ধ ভোটার তালিকা, নির্বাচনী আসন পুনর্বিন্যাস, রাজনৈতিক দল ও কার্যক্রমে আওয়ামী লীগের অবস্থান স্পষ্ট করা ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলসহ সর্বপরি জনগণের আস্থা অর্জন। সেই সাথে একেক সময়ে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোসহ জুলাই আন্দোলনে অবদান রাখা ব্যক্তি সহ ছাত্র নেতৃত্বের ভিন্ন ভিন্ন দাবি, দফা, প্রতিবাদ এবং কমিশন অবরুদ্ধ করে রাখা থেকে শুরু করে পুরো নির্বাচন কমিশন ও ব্যবস্থাপনার সংস্কার কমিটির প্রস্তাব, সুপারিশ ও শেষপর্যন্ত জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের যাবতীয় সিদ্ধান্ত মেনে নির্বাচন আয়োজন।


কখনো সরকার নিজে, কখনো বৃহৎ রাজনৈতিক দল, জোট ও ছাত্র নেতৃত্ব এই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি পক্ষপাতদুষ্ট ও চাপ সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করেছে। সরকারপক্ষ নিজেরা আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গ, তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের অবস্থান, জাতীয় না স্থানীয় নির্বাচন, পিআর নাকি প্রচলিত পদ্ধতি, গণভোট না সংসদ, উচ্চ ও নিম্নকক্ষসহ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত চাপিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের ওপর। যেসব যাবতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক সমস্যা ও প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিকভাবে সমাধান ও ব্যাখ্যা নিজেরা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে বা উত্তরদানে ব্যর্থতা এড়াতে অযাচিতভাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চেয়ে প্রাথমিক কর্তব্য পালন করেছে শুধু।


কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষে দায়িত্ব নেওয়া নাসিরউদ্দিন কমিশন প্রধান উপদেষ্টা, সরকারের অন্য উপদেষ্টা, বৃহৎ রাজনৈতিক দল, ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বসহ সেনাবাহিনী, পুলিশ, জনপ্রশাসন এবং সংবাদমাধ্যম সবার বিচার-বিশ্লেষণ, উদ্দেশ্য, অভিমত ও অভিযোগ এবং সংস্কার প্রস্তাবসহ ঐক্যমত কমিশনের সিদ্ধান্ত পালন এমনকি জুলাই সনদ সামনে রেখে তারা নিজেদের কাজ নিরলস নিষ্ঠায় করে গেছেন, যা সত্যিকার অর্থে প্রমাণিত হতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তফসিল ঘোষণার পর থেকে।


তফসিল ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সারাদেশে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানারসহ যাবতীয় প্রচারপত্র কোনো রকম প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ব্যতীত সরিয়ে ফেলাটা সত্যিই এবার প্রথম দেখলো দেশবাসী। পরবর্তী ধাপ অর্থাৎ প্রার্থীদের মনোনয়ন সংগ্রহ ও দাখিল, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ২৯ ডিসেম্বর শেষ হয়। সেক্ষেত্রে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পারস্পরিক সংঘাত ও অবিশ্বাস, গত দেড় বছর ধরে চলতে থাকা আইনশৃঙ্খলার অবনতি, সহস্রাধিক সহিংস ঘটনাসহ হাদি হত্যাকাণ্ডের ন্যায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৫১টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ, সহস্রাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ বৃহৎ রাজনৈতিক দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সবমিলিয়ে ৩ সহস্রাধিক প্রার্থী কোনো রকম বিপত্তিকর ঘটনা ছাড়া মনোনয়ন সংগ্রহ সম্পন্ন করে আড়াই হাজারের অধিক জমা দেন। সর্বশেষ গত ৪ জানুয়ারি নির্বাচনী যাচাই-বাছাইয়ে বড় রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপ্রাপ্ত থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পরিভাষায় হেভিওয়েট অনেক তারকা প্রার্থীসহ স্বতন্ত্র মিলিয়ে ৭২৩ জন বাদ পড়ে। আর তাদের অধিকাংশ আপিলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি নিলেও এখনো পর্যন্ত কেউ নির্বাচন কমিশনকে ব্যক্তিগতভাবে দোষারোপ করেনি বা তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে অভিযোগ তোলেনি। সেই সাথে কমিশন কর্তৃক প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত সকল প্রার্থীকে প্রচারণা বন্ধের যে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, আশ্চর্যজনকভাবে সেটাও মেনে চলতে হচ্ছে হাজারো উৎফুল্ল কর্মী-সমর্থক বেষ্টিত প্রার্থীদের।


এসব নিরিখে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরছে ! বাকিটা দেখার অপেক্ষায় সমগ্র দেশবাসী…


More News Of This Category