আন্তর্জাতিক বার্তা:
মধ্যপ্রাচ্যের সহিংস রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন অধ্যায় খুলেছে। ইয়েমেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত মাটিতে পরিস্থিতি বর্তমানে আন্তর্জাতিক দুই প্রভাবশালী শক্তি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)-র মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধে রূপ নিয়েছে — যা শুধু ইয়েমেনকে নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
যুদ্ধের নতুন পর্ব: এসটিসি বনাম সরকারি বাহিনী
গত সপ্তাহ থেকে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) তাদের পূর্বাঞ্চলে বড় সামরিক অভিযান শুরু করেছে এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলি দ্রুত দখলে নিচ্ছে। এই গোষ্ঠী দক্ষিণ ইয়েমেনকে স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে এবং গত ৩ জানুয়ারি তাদের নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন আগামী দুই বছরের মধ্যে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এসটিসি-র এই আগ্রাসনের পরে, সৌদি আরব এসটিসি ও সরকারি বাহিনীর অবস্থানকে কেন্দ্র করে জোরালো বার্তা দিয়েছে এবং পরিস্থিতি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে — বিশেষ করে হাদরামাউত ও মাহরা জেলার মতো সীমান্তবর্তী স্থানে।

বিমান হামলা ও হতাহতের খবর: সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে মিনিমাম ২০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যেখানে বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধা উভয়ই হতাহত হয়েছে।
এই হামলা এসটিসি-এর সামরিক শিবির ও আল-খাশা অঞ্চলে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। সঙ্গে খবর আসে, মুকাল্লা বন্দরে বিমানবাহিনী হামলায় বিভিন্ন সামরিক যানবাহন ধ্বংস হয়েছে।
সৌদি আরব-ইউএই দোটানা: বন্ধুত্বের শিখরে সংঘাত
ইয়েমেনের মতো ঘোলা পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও ইউএই একসঙ্গে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসলেও, সম্প্রতি তাদের নির্দেশনা ও অবস্থানের মধ্যে বিরাট ফাটল দেখা দিয়েছে। বিশেষত এরপর থেকে:
সৌদি আরব ইয়েমেন-এ সকল আমিরাতি সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে এবং আবুধাবি সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছে।
সৌদি আরবের আলটিমেটামের পর ইউএই তাদের মিশন শেষ করে সৈন্যদের বের করে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
এসটিসি-কে অস্ত্র এবং বারুদ সরবরাহ সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, যা তাদের সম্পর্ককে নতুন করে খতিয়ে দেখাচ্ছে।
এই বিরোধ শুধু ইয়েমেনের পরিস্থিতি নয়, বরং গালফ সহযোগিতা ও উপসাগরীয় নিরাপত্তা স্থিতিশীলতার উপরও প্রশ্ন তুলছে।

সৌদি আরবের সংলাপ আহ্বান
এই সংকটের মধ্যেই সৌদি সরকার যেমন রিয়াদে একটি বিস্তৃত সংলাপের দাওয়াত দিয়েছে — যেখানে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের সব রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী অংশ নেবে বলে বলা হয়েছে।
এসটিসি-ও এই আহ্বানকে স্বাগত জানিয়েছে এবং বলেছেন এটি দক্ষিণের মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়টি সামনে আনার একটি সুযোগ হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই উদ্যোগ হল মূলত কূটনৈতিক চাপ এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা; বাস্তবে সংঘাত কমাতে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
ইয়েমেন: যত জটিল সংঘাত
ইয়েমেনে গৃহসঙ্ঘাতের সূত্রপাত ২০১৪ সালে, যখন ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা সহ বড় অংশ দখল করে নেয়। এর পর সাল থেকে সৌদি ও ইউএই-সমর্থিত বাহিনীর প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ২০২২ সালে প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল; কিন্তু এখন সেই জোটের ভেতরেই বিরোধ তীব্র হয়েছে।
এই সংঘাত এখন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়, বরং গণতান্ত্রিক কাঠামো, স্বাধীনতা দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক শক্তির কৌশলগত হিসাবনিকাশের একটি বৃহৎ জটিল মিশ্রণ।
ইয়েমেনের সাম্প্রতিক উত্তেজনা কেবল একটি দেশীয় সংঘাত নয়; এটি দুটি উপসাগরীয় শক্তির মধ্যে বিরোধের আকার ধারণ করেছে, যার ফলে হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপন্ন, রাজনৈতিক চক্রান্ত জটিল হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।