রোজবার্তা সম্পাদকীয়ঃ
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দোর্দণ্ড প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রবিউল আলম শিকদার। দলীয় কার্যক্রমের প্রায় আশি ভাগই তার একক নেতৃত্বে পরিচালিত হতো বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। আওয়ামী লীগ শাসনামলেই নয়, ২০২৪ সালে সরকার পতনের পরও তিনি এলাকায় নিজের আধিপত্য ও দলীয় অবস্থান ধরে রাখতে সক্রিয় ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সহস্রাধিক দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিয়মিত মহড়া দিয়ে তিনি এলাকায় প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সংগঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন।
এদিকে দলীয় রাজনীতিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তারকারী আরেক নেতা ছিলেন ফারুক খান তনয়া কান্তারা খান। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তাকে কেন্দ্র করে রাতারাতি গড়ে ওঠে একটি ঘনিষ্ঠ বলয়। এই বলয়ে ছিলেন আবুল কাশেম রাজ (বিএনপি সখ্য), মিজানুর রহমান লিপু (সেলিমুজ্জামান সখ্য), লুৎফর রহমান মোল্লা (কারাফেরত), রিফাতুল আলম মুছা, কামরুজ্জামান কামাল (প্রথম পদত্যাগী), রবিউল আলম মোল্লা, কুটি খানসহ ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী।
কান্তারা খানের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে। সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের অধিকাংশ নেতা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এম এম মহিউদ্দিন আহমেদ মুক্তু মুন্সীকে সমর্থন জানালেও কান্তারা খান নিজ উদ্যোগে আবুল কাশেম রাজকে প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনী মাঠে নামান। যদিও তিনি জয়লাভ করতে পারেননি, তবে ফলাফল খুব একটা হতাশাজনক ছিল না।
এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই কার্যত খণ্ডিত হয়ে পড়ে মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর সাংগঠনিক কার্যক্রম। এ ছাড়া দলীয় ও পেশিশক্তির প্রদর্শনে আরেক আলোচিত নাম উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও খান্দারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের বরখাস্ত চেয়ারম্যান মুহাম্মদ সাব্বির খান। তিনি ফারুক খানের চাচাতো ভাই হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, মুকসুদপুরের তিনটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিশ্বরোড পর্যন্ত এলাকায় তার প্রভাব বিস্তার ছিল ব্যাপক। সালিশ বৈঠক, অটো চলাচল, মাঠ-ঘাট, হাট-বাজার—সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং এগুলো ছিল তার আর্থিক আয়ের উৎস।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর সারাদেশে যে পরিমাণ নেতাকর্মী দল থেকে পদত্যাগ করেছেন, তার অর্ধেকের বেশি গোপালগঞ্জ জেলায় বলে জানা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পদত্যাগ হয়েছে মুকসুদপুর ও টুঙ্গিপাড়া উপজেলায়, আর সবচেয়ে কম কাশিয়ানীতে।
মুকসুদপুর উপজেলায় সংখ্যাগত দিক থেকে সবচেয়ে বেশি পদত্যাগ করেছেন রবিউল শিকদারের ভাবড়াশুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কান্তারা খান, সাব্বির খান, আবুল কাশেম রাজ ও ফারুক খানের জন্মভিটা খান্দারপাড়া ইউনিয়ন। এরপর পর্যায়ক্রমে মুকসুদপুর পৌরসভা, মহারাজপুরসহ অন্যান্য ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব।
এ ছাড়া সরাসরি বিএনপি প্রার্থী সেলিমুজ্জামান সেলিমের হাতে যোগদান করেন দিগনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য হাজী মোহাম্মদ আলী এবং গোবিন্দপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ওবায়দুল ইসলাম।
মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রথম পদত্যাগী হিসেবে আলোচনায় আসেন যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক কামরুজ্জামান কামাল। তিনি গত ১৫ জানুয়ারি পদত্যাগের প্রক্রিয়া শুরু করেন, যা দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। একসময় কান্তারা খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত কামাল বর্তমানে পৌর বিএনপির কার্যক্রম ও নির্বাচনী প্রচারণায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করছেন।
পরবর্তীতে পদত্যাগের তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে এবং প্রক্রিয়াটিও হয়ে ওঠে অত্যন্ত সহজ। কেউ একা, কেউবা কয়েকজন মিলে ‘মুকসুদপুর প্রেসক্লাব’ লেখা ব্যানারের সামনে, কখনো নিজ এলাকার দোকানঘরে বা নিজ বাসভবনে বসে পূর্বলিখিত কিছু ছকবাঁধা বক্তব্য পড়ে আজীবন আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে দলীয় সব কার্যক্রম, পদবি ও সাধারণ সদস্যপদসহ যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা জানান। ঘোষণার পরপরই তারা অন্য যেকোনো দল বা প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার বৈধতা অর্জন করছেন।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—এই পদত্যাগের প্রকৃত কারণ কী?
তারা কি আওয়ামী লীগের অতীত ভুল উপলব্ধি করে পদত্যাগ করছেন?
নাকি প্রশাসনিক জটিলতা ও সম্ভাব্য বিপদ এড়ানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত?
অথবা আসন্ন ক্ষমতাসীন দলের সুবিধা নেওয়ার আশায় এই দলত্যাগ?
নাকি এটি কিছু উপজেলা নেতার গোপন কৌশল—জাতীয় নির্বাচনের পর সম্ভাব্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নিজেরা বা পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ, বিজয় এবং প্রশাসনিক সুবিধা নিশ্চিত করতে কর্মীদের পদত্যাগ করিয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা?
এসব প্রশ্নের একাধিক বা কোনো একটি সত্য হতে পারে, কিংবা কোনোটিই নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ধরে নিতে হয়, তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর বক্তব্য ও আশ্বাসে প্রভাবিত হয়ে নিজ দল থেকে পদত্যাগ করে সেই প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে মাঠে নেমেছেন
তবে ঘটনাপ্রবাহ যাই হোক না কেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে প্রকৃত রাজনীতি কখনোই অন্য দল ভেঙে নিজ দল ভারী করা বা নিজ দলের দুর্দিনে অন্য দলে সুবিধা খোঁজার নাম নয়।