• সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
র‍্যাবের যৌথ অভিযানে কাশিয়ানীর আলোচিত মোকলেস হত্যা মামলার দুই আসামি আটক গোপালগঞ্জ জেলায় ১৯৭টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ মুকসুদপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সরকারি জমি দখলের দায়ে একজনের ১০ দিনের কারাদণ্ড মুকসুদপুরে এস.জে মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত সরকারি মুকসুদপুর কলেজে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত গোপালগঞ্জের শ্রমিক নেতা বাবু হত্যা মামলায় ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড মুকসুদপুরে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের পথসভা গোপালগঞ্জ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ব্যানার–ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ এই নির্বাচন বেগম খালেদা জিয়ার অর্জন মুকসুদপুরে নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মশালার সফল সমাপ্তি

কারাগারের গেটে মরদেহ, শিকলের ভেতরে মানুষ

Published রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬

রোজবার্তা সম্পাদকীয়ঃ মোঃ তারিকুল ইসলাম

স্ত্রী ও ৯ মাসের শিশুসন্তানের মৃত্যুতে প্যারোলে মুক্তির অনুমতি পাননি বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলা ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ ঘোষিত) সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। এ কারণে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে তাকে শেষবারের মতো স্ত্রী ও সন্তানের মুখ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।


পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, স্বর্ণালী ও তার শিশুসন্তানের মরদেহ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। স্বর্ণালীর দেহ ঘরের ভেতরে ফ্যানের সঙ্গে দড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়, আর শিশুসন্তানের দেহ পাশেই মেঝেতে পড়ে ছিল। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের দাবি, স্বর্ণালী দীর্ঘদিন মানসিক চাপ ও হতাশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন—প্রধানত তার স্বামী দীর্ঘ সময় ধরে কারাবন্দি থাকায়। এক মামলায় জামিন হলে সঙ্গে সঙ্গে অন্য মামলায় তাকে আটক দেখানো হতো।


গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন সাদ্দাম। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মামলায় যশোর কারাগারে বন্দি রয়েছেন।


মর্মান্তিক এই মৃত্যুর পর কারাগারের জেলারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সাদ্দামের স্বজনেরা। প্যারোলে মুক্তির আবেদনও করেন তারা। তবে জেল কর্তৃপক্ষ সেই আবেদন নাকচ করে দেয়। বাধ্য হয়ে শেষবারের মতো স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ জেল ফটকে আনার ব্যবস্থা করেন স্বজনেরা।


স্ত্রী ও সন্তানকে শেষবারের মতো দেখতে সাদ্দামকে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় পর স্ত্রীকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখেন তিনি এবং জীবনে প্রথমবার নিজের মৃত সন্তানকে কোলে তুলে নেন। এ সময় উপস্থিত কারারক্ষী ও স্বজনদের মধ্যে এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পাঁচ মিনিট পর আবার তাদের বাইরে বের করে দেওয়া হয়।


যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে শনিবার সন্ধ্যার এই দৃশ্যটি শুধু একটি পরিবারের শোক নয়—এটি রাষ্ট্রের মানবিক সক্ষমতার এক নির্মম পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।


স্ত্রী ও নয় মাসের শিশুসন্তানের মৃত্যুর পরও বিচারাধীন বন্দি জুয়েল হাসান সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য, তাও কারাগারের ভেতরে। জানাজায় অংশগ্রহণ বা পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ন্যূনতম সুযোগও দেওয়া হয়নি।


এই সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক দায় কারা কর্তৃপক্ষের হলেও রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় সরাসরি সরকারের।
কারা আইন, ১৮৯৪-এর ৪০১ ধারা অনুযায়ী বিশেষ মানবিক পরিস্থিতিতে বন্দিকে সাময়িক মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয় এবং ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলে। স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যু নিঃসন্দেহে সেই “বিশেষ মানবিক পরিস্থিতি”-র মধ্যেই পড়ে।
তবুও এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি।


পরিবারের ভাষ্যমতে, এক মামলায় জামিন পেলেই অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাদ্দামকে কারাবন্দি রাখা হয়েছে। এই ধারাবাহিক আইনি চাপ তার স্ত্রীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে বলে স্বজনদের দাবি। এবং সেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ততা থেকে এই পরিনতি।


এসব ঘটনা আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক মামলার মাধ্যমে কাউকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখে, তখন তার পারিবারিক পরিণতির দায়ও রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।
অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকার ন্যায়বিচার, সংস্কার ও মানবাধিকারের কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবে এই ঘটনায় তার বিপরীত চিত্র দেখা গেল। সরকার চাইলে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও প্যারোল দিয়ে একজন স্বামীকে স্ত্রী ও সন্তানের জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে পারত। এতে আইনের শাসন ক্ষুণ্ন হতো না—বরং সরকারের নৈতিক অবস্থান আরও শক্ত হতো।
কিন্তু সে পথ নেওয়া হয়নি।


বরং মরদেহ হাজির করা হয়েছে কারাগারের গেটে—আর জীবিত মানুষকে রাখা হয়েছে শিকলের ভেতরে। এই দৃশ্য রাষ্ট্রের কাছে মানবিকতার মূল্য কতটা, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
অথচ কিছুদিন আগে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ঘটনাও দেখেছি—থানা পুড়িয়ে দিয়েছি, পুলিশ মেরেছি বলে স্বীকারোক্তি দেওয়া একজনকে গ্রেপ্তারের পরপরই জামিন দেওয়া হয়। আবার চাঁদাবাজি মামলায় আটক এক মেয়েকে দুপুরে রিমান্ড মঞ্জুর করে সন্ধ্যায় জামিন দেওয়া হয়।


অবশ্য এদের রাজনৈতিক পরিচয় সাদ্দামের থেকে ভিন্ন। তারা নিজেদের “জুলাই যোদ্ধা” বলে দাবি করে এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা–নেত্রী। তাদের বেলায় এই একই সরকার, একই আইন হেঁটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে।


কারাগারের ভেতরে একজন মানুষ জীবনে প্রথমবার নিজের মৃত সন্তানকে কোলে তুলেছেন। বাইরে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়েছে বাতাস। আর এক্ষেত্রে সরকার থেকেছে নির্বিকার।
এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের শক্তি শুধু আইনের কঠোর প্রয়োগে নয়, সংকটের মুহূর্তে সহমর্মিতা দেখানোর মধ্যেই তার প্রকৃত পরিচয়। ইউনুস সরকার সেই সহমর্মিতার পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে পারেনি।


এই সিদ্ধান্তের দায় এই সরকারকেই নিতে হবে। এবং অমানবিকতার যে উদাহরণ তৈরি করা হলো, তার ফলাফল একদিন এই সমাজ, এই রাষ্ট্র—সর্বোপরি আমাদের সবাইকেই ভোগ করতে হবে।


More News Of This Category