রোজবার্তা সম্পাদকীয়ঃ সরদার নুরুজ্জামান
স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যে যে দুইটি প্রধান অর্জন তার একটি ৯১ সালের পশ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও অপরটি এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর এই দুই নির্বাচন প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অর্জন। ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামে দেশের গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে বেগম খালেদা জিয়ার অনড় ও আপোষহীন অবস্থান বাধ্য করে এরশাদ সরকারকে বিদায় নিতে। যার ফলে নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায় সম্ভব হয়। দেশনেত্রীর নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে ও দেশের ইতিহাসে প্রথম সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু হয় যা আজও ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় অব্যাহত।
১৯৯১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আজ যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এটিও বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক অর্জন। যিনি ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যু বরণ করলেও ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন এর মনোনয়ন পত্র জমাদানের শেষ দিন মৃত্যু সন্ধিক্ষণে ৩ টি সংসদীয় আসনে মনোনয়ন পত্রে রেখে যান হাতের ছাপ। এটিই সেই সংগ্রামের যবনিকা ও সাফল্যের স্বাক্ষর। যে তিনি বলেছিলেন ‘হাসিনার অধীনে কোন নির্বাচনে খালেদা জিয়া যাবে না’। আর সত্যিকার অর্থে তিনি যানও নি।
জুলাই ২৪ অভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামীলীগের সরকার বিদায় পরবর্তী ড. ইউনুস এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্বায়িত্ব গ্রহণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে তাতে বেগম খালেদা জিয়া অংশ নেন। যা কেবলমাত্র এই স্বীদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে তিনি বলেছিলেন নির্দলীয় সরকারের অধীনে খালেদা জিয়া নির্বাচন আদায় করে ছাড়বে। মহান রাব্বুল আলামিন তাকে সেই ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাচিঁয়ে রেখেছিলেন যাতে নির্বাচনটি অনুষ্ঠানে আর কোন অপশক্তি বাধা হয়ে দাড়াতে না পারে এবং বেগম জিয়ার জীবনের শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়।
এ কথা প্রসঙ্গতই আলোকপাত জরুরী যে ২০২৪ সালের হাসিনা বিরোধী ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। যা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের মাধ্যমে শুরু হয় এবং সমগ্র দেশবাসী সহ সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দল ও তাদের কর্মী সমর্থক, আপামর মেহনতী শ্রমিক, মজুর, রিক্সাচালক সহ নারী ও শিশু মিলিয়ে প্রায় সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত সম্পদ। ইতিহাসের অন্যতম প্রধান এই আন্দোলন কারও একক সফলতা না হলেও ছাত্রদের নেতৃত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এটা অস্বীকার করা সম্ভব নয় এবং গর্বের বিষয়। যা বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজেই বলে গেছেন ‘ছাত্রদের এই অবদান আমরা স্বীকার করি ও জুলাই চেনতা ধারণ করি’।
এখানে সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমরা অজ্ঞতার কারণে গুলিয়ে ফেলি বা ভুলে যাই তা হলো ৫ আগস্ট হাসিনা পতন আর ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ এর জাতীয় নির্বাচন এই দুইটি এক ঘটনা নয়। সম্পূর্ণ আলাদা ও ভিন্ন দুইটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। অর্থাৎ ৫ আগস্ট হাসিনার বিদায় ও প্রফেসর ইউনুস সরকারের দ্বায়িত্ব গ্রহণ ইতিহাসের একটি অধ্যায়। আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিহাসের অন্য ও সম্পূর্ণ পৃথক একটি অধ্যায়। কারণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্বায়িত্ব নেওয়ার দিন থেকে একমাত্র বিএনপির ও অল্পসংখ্যক রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলে আসছিল। কিন্তু সরকার দীর্ঘ দিনেও তাদের সময়সীমা সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। আর ছাত্র নেতৃবৃন্দ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে কখনো সদিচ্ছা দেখায়নি। যার ফলে বিএনপি বুঝতে পারে নির্বাচন অনিশ্চিত ও জাতির সামনে গণতন্ত্র অবরুদ্ধ। একপর্যায়ে বিএনপি নির্বাচনের রোড ম্যাপ ঘোষণার দাবি জানায়। কিন্তু সরকার পক্ষ তাতেও নির্লিপ্ত। এমতাবস্থায় বিএনপি যখন নির্বাচন আয়োজনের একদফা দাবিতে রাজপথে নামার ঘোষণা দেয় এবং দেশ পুরপুরি বিভক্ত ঠিক তখনই বেগম খালেদা জিয়া সব বুঝতে পেরে ড. ইউনুস ও তারেক রহমান এর লন্ডন বৈঠকের পরামর্শ দেন। আকষ্মিক সেই বৈঠকে সীদ্ধান্ত হয় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে। কেটে যায় অন্ধকার, পরাভূত হয় ষড়যন্ত্র। দেশবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ও অনিবার্য সংঘাত থেকে নিস্তার হয়। আর সে মোতাবেক আজকের এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
মনে রাখা দরকার, এখনো নির্বাচন বানচালে দেশ বিরোধী অপশক্তি ও কিছু আন্তর্জাতিক মদদ বিদ্যমান। সেই সাথে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচন না হয় সেটাই চায়। কিন্তু এই নির্বাচন বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচন। যে জন্য বিএনপির লক্ষ কোটি নেতা, কর্মী, সমর্থক সহ সমস্ত দেশবাসীকে সতর্ক থেকে এই নির্বাচন সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এটাই হবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এবং আগামী বাংলাদেশ গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা।
ইনশাআল্লাহ আমরা সফল হব।