আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
কী ঘটছে — বিক্ষোভের সূচনা ও পরিধি
ইরানে এখন নিষ্ঠুর সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও কঠোর দমনযুদ্ধ চলছে, যা ডিসেম্বর ২০২৫-এর শেষ দিকে শুরু হয়েছিল অর্থনীতি-ভিত্তিক ক্ষোভ থেকে শুরু করে দ্রুত রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়েছে। বিক্ষোভগুলো আর শুধু খাদ্য, জ্বালানি বা মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে নয় — তারা বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো ও সরকারকে পরিবর্তনের দাবি তুলেছে।
এই আন্দোলন পরিণত হয়েছে ইরানের সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিপ্লবে — যেখানে তা দেশের ৩১টি প্রদেশের শতাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিক্ষোভের অন্তর্দৃষ্টি
🔹 অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মূল প্ররোচনা
মূলত ইরানের ব্যর্থ অর্থনীতি, মুদ্রার পতন, মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকটই বিক্ষোভের শুরুতে মানুষের রাস্তায় নামার কারণ। এই অর্থনৈতিক সংকট দেশটি বহুসংখ্যক নিষেধাজ্ঞার মুখেই পতিত হয়েছে এবং মুদ্রা ও শিল্প বিকেন্দ্রণে বড় ধাক্কা খেয়েছে।
🔹 রাজনৈতিক দাবিতে রূপান্তর
শুরুতে শুধুমাত্র জীবনযাত্রার খরচের প্রতিবাদ থেকেই গতিবেগ নেওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিক কাঠামো ও শ্রেষ্ঠ নেতা-শাসকদের পরিবর্তনের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় দমন ও সহিংসতা
ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত কঠোরভাবে বিক্ষোভ দমন করেছে — এতে বহু শহরে লাইভ গুলি চালানো, ভয় সৃষ্টি করা, মিলিশিয়াদের মোতায়েন ও গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়েছে।
🔹 মৃত্যুর সংখ্যা ও মানবিক ক্ষতি
ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যার প্রামাণ্য ও আনুষ্ঠানিক তথ্যগুলো আবদ্ধ ও জটিল, তবে বিভিন্ন মহল ও মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী:
২,৫০০+ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন আলোকপাত করছে; যার মধ্যে সাধারণ বিক্ষোভকারীরাই বড় অংশ।
অনেকে সরকারি গোপন পরিসংখ্যানের তুলনায় এর চেয়ে অনেক বেশি হতাহতের ইঙ্গিতও দিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন, যদিও নির্দিষ্ট নিশ্চিত সংখ্যা জানানো কঠিন।
সহিংসতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটি ১৯৮০-এর পরবর্তী সময়ের মধ্যে ইরানের সবচেয়ে বড় দমন-জনিত সংকট বলে বিবেচিত।
🔹 যোগাযোগ ও তথ্য ব্ল্যাকআউট
ইরান সরকারই দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও টেলিফোন পরিষেবা ব্যাপকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে, মূলত বিক্ষোভকারীদের যোগাযোগ ও ঘটনাস্থলের তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়া কমাতে।
আইন ও বিচার: মৃত্যুদণ্ড ও দ্রুত বিচার
ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের কঠোরভাবে মেরে ফেলার আইন প্রয়োগ ও দ্রুত বিচারের প্রস্তুতি নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশও দেয়া হয়েছে — যদিও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তা পরে স্থগিত করা হয়েছে।
এমন এক মামলা ছিল এরফান সোলতানি নামে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যু বা মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক দলগুলো নজর দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরানের অভ্যন্তরীণ সংঘাত বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠেছে:
আমেরিকা
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে প্রত্যক্ষ দমন-পীড়নের কারণে, এবং ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রেসার বন্ধ করতে।
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ
যুক্তরাজ্যও আরও নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করেছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কঠোর নিন্দা করেছে।
জাতিসংঘ
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং মধ্যস্থতা ও মানবাধিকার রক্ষা এমনি নীতির আহ্বান জানাচ্ছে।
পরিস্থিতির সাম্প্রতিক উন্নয়ন
বর্তমান অবস্থায় কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে বিক্ষোভগুলো সামান্যভাবে কমেছে এবং সরকারের কঠোর দমন ও নিরাপত্তার কারণে দৃশ্যমান বিক্ষোভের বিষয়টি কিছুটা স্তিমিত হয়েছে।
তবে ক্ষুব্ধ সাধারণ জনগণের ভীতি, সামাজিক ক্লান্তি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকছে এবং ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত।

ইরানের বর্তমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রতিবাদ নয়; এটি দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তনের দাবি তুলেছে, এবং সরকার বিপুল কঠোরতা নিয়ে তা দমন করেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও মানবাধিকারের চাপের মধ্যে ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে, এবং এই ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতি বহুমাত্রিক — যেখানে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক দাবী, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট ও আন্তর্জাতিক চাপ একসাথে মিশে একটি সংকট সৃষ্টি করেছে যেটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজর কাড়ছে।